ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি, কিভাবে কাজ করে?

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি, কিভাবে কাজ করে? এর ইতিহাস, প্রকার এবং প্রয়োগ সম্পর্কে জানুন।
TechJhuri

আপনি কি কখনও বাস্তবতার বাহিরে সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে প্রবেশ করতে চেয়েছেন? ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব।

আপনার নিজের বাড়ির বসে আপনি প্রাচীন মিশর পরিদর্শন করতে, সমুদ্রের গভীরে ডুব দিতে, বা ছায়াপথের মধ্য দিয়ে উড়ার অভিজ্ঞতা অনুভব করতে পারেন।

দুই জন ব্যক্তি VR হেডসেট ব্যবহার করছেন।

অর্থাৎ, VR একটি সিমুলেটেড 3D অভিজ্ঞতা যা বাস্তব জগতের অনুরূপ বা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

এটি কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। VR প্রায় কয়েক দশক ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে, কিন্তু সম্প্রতিক সময়ে আলোচিত মেটাভার্স এবং বাড়িতে ব্যবহারের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের VR হেডসেট প্রকাশের মাধ্যমে অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই পোস্টে, আমরা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আলোচনা করবো।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি?

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি তা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে বাস্তবতা কি। বাস্তবতা হলো আমাদের চারপাশের পরিবেশ যা আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়গুলির মাধ্যমে অনুভব করি। আমরা যা দেখি, শুনি, স্পর্শ করি, গন্ধ বা স্বাদ অনুভব করি তা আমাদের বাস্তবতার অংশ। কিন্তু কম্পিউটার একটি কৃত্রিম বা অপ্রকৃত পরিবেশ তৈরি করতে পারে যা আমাদের বাস্তবতার মতো দেখাতে পারে বা আমাদের বাস্তবতার অনুভূতি দিতে পারে। এই কৃত্রিম পরিবেশকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বলে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে আমরা এমন কিছু অনুভব করতে পারি যা আমাদের বাস্তব পরিবেশে করা সম্ভব নয় বা খুবই কষ্টসাধ্য। যেমন, আমরা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে চাঁদে যেতে পারি, ছায়াপথের মধ্য দিয়ে উড়ে যেতে পারি, ডায়নোসরের সাথে খেলা করতে পারি বা অন্য কোনো কাল্পনিক জগতে যেতে পারি। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আমাদের বাস্তবতার সীমা ছেড়ে যেতে সাহায্য করে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি তৈরি করার জন্য আমাদের কিছু বিশেষ প্রযুক্তি বা ডিভাইস প্রয়োজন। যেমন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট, হ্যান্ড-হোল্ড কন্ট্রোলার, অডিও ডিভাইস ইত্যাদি।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) মূলত তিন প্রকারের:

Fully immersive VR: এ ধরনের ভিআর বাস্তব জগতকে ব্লক করে এবং ব্যবহারকারীকে একটি নতুন পরিবেশে নিয়ে যায়।

Wearing VR headset

Semi-immersive VR: এ ধরনের ভিআর বাস্তব জগতকে একটি ভার্চুয়াল পরিবেশের সাথে একত্রিত করে, যা ব্যবহারকারীকে একই সময়ে উভয়ই দেখতে দেয়। এর একটি উদাহরণ হলো অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR)।

Non-immersive VR: এর জন্য হেডসেট এর প্রয়োজন প্রয়োজন হয় না, কম্পিউটার বা মোবাইল ডিভাইসে দেখা যেতে পারে। এর একটি উদাহরণ হল গুগল স্ট্রিট ভিউ।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ইতিহাস

ভার্চুয়ালিটির ধারণাটি অনেক আগে থেকেই রয়েছে। এর প্রথম ধারণাটি হয় 1838 সালে স্টেরিওস্কোপ আবিষ্কার করার পর।

স্টেরিওস্কোপ একটি বিশেষ টুল যা 3D ছবি দেখতে সাহায্য করে। এটিতে ডান এবং বাম চোখের জন্য দুটি পৃথক চিত্র বা ছবি রয়েছে। স্টেরিওস্কোপের মাধ্যমে তাকানো হলে ছবিগুলো একত্রিত হয়ে একটি একটি 3D ছবি তৈরি করে।

যদিও "ভার্চুয়াল রিয়েলিটি" শব্দটির প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল 1980-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে,  যখন VPL রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন বিজ্ঞানী জ্যারন ল্যানিয়ার "ভার্চুয়াল রিয়েলিটি" বলে অভিজ্ঞতার জন্য গগলস এবং গ্লাভস সহ গিয়ার তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। যদিও তার আগেও, প্রযুক্তিবিদরা সিমুলেটেড পরিবেশ তৈরি করছিলেন।

1980 এবং 1990 এর দশকের প্রথম দিকের VR সিস্টেমগুলি ব্যপক ব্যয়বহুল ছিল এবং খুব একটা পরিচিত ছিল না। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে VR আরও পরিচিত এবং সাশ্রয়ী হয়েছে।

2010-এর পর, বাড়িতে ব্যবহারের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের ভিআর হেডসেটগুলির প্রকাশ, যেমন ওকুলাস রিফ্ট এবং এইচটিসি ভিভ, ভিআর-এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করেছিল।

তারপর থেকে, স্বতন্ত্র VR সিস্টেমের বিকাশ এবং স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মতো অন্যান্য শিল্পে VR প্রযুক্তির একীকরণের সাথে VR শিল্পটি ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং বিকশিত হয়েছে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কিভাবে কাজ করে?

VR হেডসেট এবং কন্ট্রোলার

ভিআর অভিজ্ঞতার সবচেয়ে সাধারণ উপায় হল একটি হেডসেট পরা, এটি এমন একটি ডিভাইস যা মাথায় পরা হয় এবং চোখ ঢেকে রাখে।

হেডসেটটিতে প্রতিটি চোখের জন্য একটি স্ক্রিন এবং সেন্সরগুলির একটি সেট রয়েছে যা ব্যবহারকারীর মাথার গতিবিধি ট্র্যাক করে। বিভিন্ন ধরনের ভিআর হেডসেট রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

পিসি-ভিত্তিক ভিআর সিস্টেম: এই ধরনের ভিআর সিস্টেমগুলি চালানোর জন্য কম্পিউটারের প্রয়োজন হয়।

Standalone ভিআর সিস্টেম: এই সিস্টেমগুলিতে কম্পিউটারের প্রয়োজন হয় না উদাহরণস্বরূপ VIVE Focus 3 ভিআর।

মোবাইল ভিআর সিস্টেম: এই ভিআর সিস্টেমে স্ক্রীন হিসাবে একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করা হয়। তাই এ ধরনের ভিআর এর দাম তুলনামূলক ভাবে কম। যেমন: Google কার্ডবোর্ড।

হেডসেট ছাড়াও, ভিআর সিস্টেমে হ্যান্ড-হোল্ড কন্ট্রোলারও থাকতে পারে যা ব্যবহার করে ব্যবহারকারী ভার্চুয়াল পরিবেশের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে ব্যবহার করতে পারে। কন্ট্রোলার গুলিতে সেন্সর থাকে যা ব্যবহারকারীর হাতের নড়াচড়া ট্র্যাক করে এবং এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী VR বিশ্বের বস্তুগুলি বাছাই এবং পরিচালনা করতে পারেন।

ভার্চুয়াল বাস্তবতায় ট্র্যাকিং এবং রেন্ডারিং:

ট্র্যাকিং হলো যখন VR হেডসেট এবং কন্ট্রোলারের সেন্সরগুলি আপনার গতিবিধি দেখে এবং রেকর্ড করে।

আপনার হেডসেটের স্ক্রিনে দেখানোর জন্য VR সিস্টেমের 3D গ্রাফিক্স তৈরি করার প্রক্রিয়া হলো রেন্ডারিং।

আপনার মাথা নড়াচড়া করার সাথে সাথে কম্পিউটারকে গ্রাফিক্স আপডেট করতে হয়, যাতে ভার্চুয়াল বিশ্ব মসৃণ এবং বাস্তবভিত্তিক মনে হয়। একে রিফ্রেশ রেট বলা হয় যা হার্টজ (Hz) এ পরিমাপ করা হয়।

এই সবগুলি একত্রে কাজ করে বলেই VR অভিজ্ঞতা এমনভাবে অনুভূত হয় যে আপনি সত্যিই অন্য জায়গায় আছেন।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এর প্রয়োগ

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির বিস্তৃত প্রয়োগ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

গেমিং: ভিআর এর সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যবহার হলো গেমিং এর জন্য। VR গেমগুলি একটি অনন্য গেমিং অভিজ্ঞতা প্রদান করে যা সাধারণত উপায়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

A boy wearing VR headset and gaming

শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ: শিক্ষাগত এবং প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে VR ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ছাত্র এবং শিক্ষক একটি নিরাপদ এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শিখতে ও অনুশীলন করতে পারবে।

বিনোদন: VR ব্যবহার করে অনন্য বিনোদন অভিজ্ঞতা তৈরি করা যায়। এতে ভার্চুয়াল মুভি দেখা, কনসার্ট থেকে ভার্চুয়াল থিম পার্ক সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

থেরাপি: শারীরিক বা মানসিক অবস্থার রোগীদের সাহায্য করার জন্য VR ব্যবহার করা যেতে পারে। 

ব্যবসা এবং নকশা: VR বিভিন্ন ব্যবসায়িক এবং ডিজাইনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন পণ্যের ভিজ্যুয়ালাইজেশন, আর্কিটেকচার ডিজাইন এবং সিমুলেটেড প্রশিক্ষণ ইত্যাদি।

উপসংহার

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি একটি অত্যন্ত উন্নত ও অভিনব প্রযুক্তি যা আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকার করতে পারে। যেমন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে আমরা গেমিং, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞাপন, চিকিৎসা, বিনোদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আরও ভালো অভিজ্ঞতা পেতে পারি। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আমাদের কাল্পনার সীমা বাড়াতে এবং নতুন নতুন জিনিস শিখতে সাহায্য করে।

তবে, ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কিছু নেতিবাচক প্রভাব ও রয়েছে। যেমন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে আমরা বাস্তব পরিবেশ থেকে দূরে সরে যেতে পারি, শারীরিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হতে পারি।

যেহেতু VR প্রযুক্তি ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছে এবং আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে, সম্ভবত ভবিষ্যতে আমরা বিভিন্ন শিল্পে VR এর আরও ব্যাপক ব্যবহার দেখতে পাব। এটি মজার জন্যই হোক কিংবা শেখার বা কাজের জন্যই হোক না কেন, VR একটি অনন্য এবং নিমগ্ন অভিজ্ঞতা প্রদান করে যা বিশ্বের সাথে আমাদের জড়িত থাকার উপায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রাখে।

সামগ্রিকভাবে, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হলো একটি উত্তেজনাপূর্ণ এবং দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্র যা প্রযুক্তি এবং একে অপরের সাথে আমাদের যোগাযোগের উপায়ে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন